Posts

শ্রাবন্তিকা চাইতো শ্রাবণ অঝোর মতন। ঠিক যতটায় আকাশ ভাঙ্গে, ঠিক যতটায় মেঘরা রাঙ্গে কালচে রকম। তাইতো বুঝি তার দু চোখে রয় লুকিয়ে পাঁপড়ি ভাঙ্গা অশ্রুপাবন অলিন্দটার রূপকথাদের সঙ্গে নিয়ে। মেঘের মত কালচে আঁকা তীব্র চোখে শ্রাবন্তিকা ঠায় তাকিয়ে থাকতো কেবল ঝুম অঝোরের বৃষ্টিশোকে। আর শ্রাবণের লাগতো ভাল ইলশে গুঁড়ি। দু'এক ফোঁটা দ্রোহী চুলে আর কতটা ঝাপটা মাতাল মেঘের নুঁড়ি। সেই ছেলেটা বোশেখ ঝড়ে যেমন শালিক খুব মাতাল আর ঝঞ্ঝাক্ষোভে ফের খুঁজে নেয় অলিন্দ এক। নিক খুঁজে নিক। অলিন্দটায় শ্রাবন্তিকার অশ্রুপাবন খেলতো মেঘ আর নীরের খেলা, ভাঙ্গতো আকাশ, ভাঙ্গত ভাঙ্গন, ভাঙ্গত আপন। দেখল শ্রাবণ ঢের হয়েছে বোশেখ খেলা। শ্রাবন্তিকার কালচে চোখে একটু করে বুলিয়ে দিল শরৎ ভেলা। ফোঁটায় ফোঁটায় খুবলে নিলো মেঘের নুঁড়ি। থর-বিথরে ছুড়ল সেসব শ্রাবন্তিকা চিনলো তখন ইলশেগুঁড়ি। যেমন করে মাতাল শালিক ছড়ায় ডানা, সেই শ্রাবণের নীলচে সে শার্ট থাকতে কোথাও অশ্রুপাবন ঝরতে মানা।

পারস্পরিক নৃশংশতা

অথচ আমাদের কতগুলান শব্দ জমা হয়া ছিলো।  বলা হইলো না। কিছুই বলা হইলো না। নিশিবকের ঠোঁটের রংটা দেখা হইলো না। কাঁঠাল পাতার শুকনা ঘ্রাণটা শোঁকা হইলো না। মাঘসংক্রান্তির কুয়াশা জড়ানো হইলো না। এক বিকেল নিস্তরঙ্গতায় ঘুমানো হইলো না। শ্যাওলা পড়া দেয়ালটার দুই পাশে যে দুইটা কুকুর রাজ্য আছে তাদের কাউরেই জাতিভেদের অপকারিতা বোঝানো হইলো না। অবশ্য আমরা নিজেরাই কখনও বুঝে উঠতে পারি নাই মানুষভেদের অপকারিতা। মানুষভেদের দীনতা। মানুষভেদের নৃশংসতা। আমরা পাশাপাশি হাঁটছি, ঘুরছি, ফিরছি। লোকলজ্জারে বুইড়া আঙ্গুল দেখায়া মাঝরাস্তায় চুমু খাইছি। তারপরও দুইজনের মাঝখানে রাইখা দিছি দুই নারিকেল গাছ পরিমাণ ব্যবধান। দুইজনের মাঝখানের ভেদাভেদ রাবার দিয়া মুইছা হৃদপিণ্ডটারে খাঁমচে আঁকড়ায় ধরার সাহস করি নাই আমরা কেউই। কখনই করি নাই। আমরা নিজেদের ওপর আরোপ কইরা রাখছি নৃশংস এক দৈন্য। অথচ আমাদের কতগুলান স্বপ্ন জমা হয়া ছিলো। দুঃস্বপ্ন ছাড়া তার কিছুই শোনা হইলো না। কিছুই দেখা হইলো না।

এক শালিকের নীল গল্প

 এক শালিকের গল্প ছিল নীলচে পাতায়।  আকাশ ছিল রাজ্যপট আর রাজত্ব তার মেঘ-কুয়াশায়।  ভবঘুরে ধূলো যেমন, পথরা যেমন, যেমন ঝরে ইলশেগুড়ি;  শালিকটাও উড়ত তেমন, ভিজত তেমন। গায় মাখাতো মেঘের কুঁড়ি।    আরেক ছিল পাথর-প্রাসাদ লাল পাহাড়ের চূড়ার ওপর।  উড়তে উড়তে একলা শালিক বসল এসে জানালার ’পর।  সেথায় ছিল মেঘবালিকা। রাজ্য তাহার অশ্রুর জল।  চার দেয়ালের নিরেট ঘরে থাকত নিয়ে আঁখি টলমল।  জানলাটা তার অলস সাথী। দিন কাটাতো ঠায় তাকিয়ে।  অনেকগুলো স্বপ্ন ছিল। কাটতো জীবন স্বপ্ন নিয়ে।  স্বপ্নগুলো স্বপ্ন হয়ে স্বপ্নেই রয়।  মেঘবালিকা, অশ্রুর জল, জানলাটা আর স্বপ্ন কেবল আর কেউ নয়।    অনেক উড়ে ভবঘুরে শালিক পাখি বসল এসে সেই জানালায়।  মেঘবালিকা দেখল তারে আসতে উড়ে নীল সীমানায়।  আদর করে ধান ছিটালো, বলল কথা, ঝরালো জল।  শালিক পাখি বুঝলনা বা বুঝল মেয়ের সব কোলাহল।  পালক দিয়ে মুছল তাহার অশ্রুজল আর দুঃখগাঁথা।  ইলশেগুড়ি কুড়িয়ে এনে দিল ধুয়ে মনের ব্যাথা।  মেঘবালিকা জল ঝরালো। শালিক দিল ছড়িয়ে ডানা।  অশ্রুজলে ভিজল ডানা। ভিজল হৃদয়। বুঝ...

বাতাসে রুদ্রের গন্ধ

Image
কবিতার সংজ্ঞা দেওয়া খুব কঠিন। যে লেখাটি সমকালের স্মৃতি বা স্বপ্নকে তুলে আনতে সক্ষম এবং একই সাথে সমকালকে অতিক্রমের যোগ্যতা রাখে তাকেই বোধহয় কবিতা বলা যেতে পারে। অবশ্য তা হবে কবিতার অন্যান্য ব্যাকরণের শর্ত সাপেক্ষে। — এভাবেই কবিতার সংজ্ঞা দিয়েছিলেন রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। [1] এবং নিজের জীবনে তার নিজের দেয়া সেই সংজ্ঞার প্রতিফলনও ঘটিয়েছেন যথার্থতার সাথেই। একই সাথে তিনি তার লেখায় তুলে এনেছেন সমকালীন স্মৃতি-স্বপ্ন-সাধ। আবার তার কবিতার মূর্ছনাই তার নিজস্ব সময়ের গণ্ডিকে অতিক্রম করে হয়ে উঠেছে সর্বকালীন। মৃত্যুর দুই যুগ পর আজও তাই রুদ্র আছে আমাদের ভেতরে, আমাদের বাহিরে। রুদ্র আছে আমাদের হৃদয় জুড়ে। আনুমানিক উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে তৎকালীন খুলনা জেলার বাগেরহাট মহকুমার রামপালের জঙ্গল কেটে বাসযোগ্য কর হয়েছে। অত্যন্ত সাহসী ও পরিশ্রমী কিছু মানুষের সদ্য সৃষ্টি জনবসতিটিকে ঠিক গ্রামও বলা যায় না। কাছেই দেশখ্যাত পীর খানজাহান আলীর মাজার। সেখানে প্রায়শই আসতেন তার ভক্ত ধোনাহ খা। পরে সেখানেই বসবাস করা শুরু করেন এবং কালক্রমে বিশাল ভূ-সম্পত্তির অধিকারী হন। পরবর্তীতে তার পুত্র মোংলাই হাজীর মেজো পুত্র শে...

নিকষ

(১) -এখন কোথায় তুই? :ফেরিতে। পদ্মায়। -কী করছিস? :স্বর্ণাপুর বকর বকর শুনছি। প্যানপ্যান করে কান ঝালাপালা করে দিল আমার। -হা হা হা। শুনতে থাক। :হাসবি না একদম বলে দিলাম। আমার জ্বালা আমি বুঝতেছি। -পিচ্চি, তোকে একটা কথা বলি? রাখবি? :হঠাৎ সিরিয়াস হয়ে গেলি! কী হয়েছে? বল। আমার বুড়িপুর কথা আমি রাখব না, এ হতে পারে? -রাতে অন্তত ওখানে... :আবার শুরু করলি! তোকে বলেছি না, এসবে আমার এক ফোঁটা বিশ্বাস নেই। তাই আমাকে এসব বলেও লাভ নেই। রাখলাম। বাই। -খোদা হাফেজ। (২) আমি যে বাড়িতে আছি, সেটা আমাদের গ্রামে তো বটেই আশেপাশের দশ গ্রামে মোটামুটি প্রখ্যাত বাড়ি। ভাল কোন কারণে খ্যাতি না। পোড়া বাড়ি হিসেবে খ্যাতি। সহজ ভাষায় বললে ভুত প্রেত সমৃদ্ধ বাড়ি। একটা ভূতের সাথে এক রাত গল্প করার শখ আমার অনেক দিনের সেই সুবাদেই এখানে আসা।

দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প

Image
১৮৫৪! ক্রিমিয়ার যুদ্ধের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে হুতাশনের মত। যত্রতত্র আহত সৈনিকেরা ছড়িয়ে আছে। দেখার মত নেই কেউ। ইউরোপে প্রভুত্ব কায়েমের নিমিত্তে রাশিয়ার সাথে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স আর ইতালির এই যুদ্ধে যতটা না বিভীষিকা ছড়াচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্রে, তার চেয়ে কিছু কম আসছে না হাসপাতালে। আহত সৈনিকদের আহাজারিতে তার বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। হাসপাতালের ধারণ ক্ষমতা পার হয়ে গেছে বহু আগেই। তবু, নতুন আহত সৈনিক আশা বন্ধ হচ্ছে না। স্ক্যাটারি (বর্তমান ইস্তানবুলের অন্তর্গত) এর হাসপাতালের অবস্থা তখন এক শব্দে — বিভীষিকাময়! ব্রিটেনের যুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা সিডনি হারবার্ট  এর কাছে তখন মনে হল, পুরো ইংল্যান্ডে কেবল এক জনই এই সময়ে সব কিছুর হাল ধরার সক্ষমতা রাখেন — ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল ।

রামমোহন রায়: ধর্মকে ছিঁড়ে যুক্তিতে বাঁধলেন যিনি

Image
“আমরা মৃতের বধূ হবার জন্য জীবিত নারীকে নীত হতে দেখেছি।” — অথর্ব-বেদ (১৮/৩/১,৩) “মানুষের শরীরে সাড়ে তিন কোটি লোম থাকে, যে নারী মৃত্যুতেও তার স্বামীকে অনুগমন করে, সে স্বামীর সঙ্গে ৩৩ বৎসরই স্বর্গবাস করে।” — পরাশর সংহিতা (৪:২৮) “যে সতী নারী স্বামীর মৃত্যুর পর অগ্নিতে প্রবেশ করে সে স্বর্গে পূজা পায়।” — দক্ষ সংহিতা (৪:১৮-১৯) “যে নারী স্বামীর চিতায় আত্মোৎসর্গ করে সেতার পিতৃকুল, স্বামীকুল উভয়কেই পবিত্র করে।” — দক্ষ সংহিতা (৫:১৬০) [1] [11] আমাদের, উপমহাদেশ-বাসীদের শিরায়-উপশিরায় প্রতিনিয়তই প্রবাহিত হয় ধার্মিকতার স্রোত। কখনও হাত কেটে গেলে যদি লাল লাল রক্তের পরিবর্তে নীল নীল ধার্মিকতা বেরিয়ে আসে, তাহলে অবাক হবার খুব বড় কোন উপলক্ষ থাকবে না। সেই সব ধর্মকে আমরা গড়ে নিই নিজেদের মত করে। ধর্মগ্রন্থের সাথে আমাদের পালিত ধর্মের কোন সংযোগই থাকে না। তারপর সেই বিকৃত ধর্মকেই পালন করে যাই পরম যতনে। আর যেখানে খোদ ধর্মগ্রন্থসমূহেই রয়েছে এমন বর্বরতার উপলক্ষ — সেটাকে হাতছাড়া করার কোন প্রশ্নই আসে না। আর তাই সমগ্র ভারতবর্ষের মাটি কত জীবিত সতীর মৃত ভস্মকে আলিঙ্গন করল, তার কোন লেখাজোকা ইতিহাসে নেই। নজরুলের মত...